নভেল করোনা ভাইরাস, গ্রাম্য বধু ও কিছু কথা..

নভেল করোনা ভাইরাসের কারণে জনজীবনে এসেছে অসম্ভব পরিবর্তন। এসময় অনেকেই অনেক কিছু করছেন যা ইতোপূর্বে তারা করেননি। এই যেমন ধরুন একটানা এতদিন ছুটি পাওয়া। আবার পরিবারের সাথে এতদিন সময় কাটানোর সুযোগও হয়ত অনেকে পেয়ে ওঠেননি কখনো তাদের ব্যস্ততার কারণে।
নভেল করোনা ভাইরাস জনজীবনে আতংক সৃষ্টি করলেও কিছুটা স্বস্তিও এনেছে কারও কারও জীবনে।
আজ সেসব কথা বলব না।

একটা বিষয় আর এক শ্রেণির মানুষের কথা বলব আজ। বিষয়টি হলো ঘরে থাকা। একটানা ঘরে থাকতে গিয়ে হাপিয়ে উঠেছেন অনেকেই। অনেকে ডিপ্রেশনে পড়ে যাচ্ছেন। অনেকে আবার জীবনের মানে হারিয়ে ফেলেছেন ঘরে থাকতে থাকতে। অথচ আজ আমি যাদের কথা বলব তারা বাড়ির বাইরে যান নাই বহুদিন। ঘর আর উঠোন যাদের পৃথিবী। আজ বলতে চাই এমন কিছু মানুষের কথা যাদের জীবন নভেল করোনা ভাইরাস আসার আগেও যেমন ছিল এখনও তেমন আছে।।

তারা হচ্ছেন আমাদের গ্রামাঞ্চলের গৃহিণী সমাজ।
গ্রামাঞ্চলের বলছি কারণ শহরের যে সব গৃহিণী আছেন তাদের জীবন একটু ভিন্ন গ্রামের থেকে। তারা হয়ত আর কিছু করুন না করুন মাঝে মাঝে বাজার করতে বাইরে যান।

আমি গ্রামের মেয়ে। নিরেট গ্রাম বলতে যা বোঝায়। এখানে আমরা সবাই মিলেমিশে থাকি আবার ঝগড়াঝাটি ও করি। তারপরেও একে অপরের বিপদে এগিয়ে আসি। আবার ইচ্ছে করে অন্যকে বিপদেও ফেলি।

যাক সেসব কথা। বলছিলাম গ্রামের গৃহবধুদের কথা। আমাদের গৃহিণী সমাজের কথা। যাদের অনেকে আজ দাদী হয়েছেন, কেউ বা শ্বাশুড়ি হয়েছেন, কেউ মা হয়েছেন আবার কেউ বা এখনও শুধু বধুর ভূমিকাতেই আছেন। অথচ তাদের ৯০ ভাগের জীবন কাটে ঘর আর উঠোন মিলে। অনেকের জন্ম একই গ্রামে অথবা পাশের গ্রামে। অথবা অনেকে বিয়ের আগে মুক্ত পাখি থাকলেও বিয়ের পরে হয়েছেন সোনার খাচার পাখি।
সারাদিন রান্না, ঘর ঝাড়ু, বাসন মাজা, গরু-ছাগলকে খাওয়ানো, ধানের কাজ, স্বামীর সেবা, শ্বশুর-শ্বাশুড়ির সেবা-যত্ন, বাচ্চা-কাচ্চার পালন এসবের মাঝেই দিন কাটে।

করোনা ভাইরাস আসার আগেও তাদের ডিউটি ছিল ঘর আর উঠোন এখনো তাদের ডিউটি ঘর আর উঠোন।

এখন বরং কাজটা একটু বেড়েছে বৈকি কমেনি। বাড়িতে মানুষজন কম থাকলে কাজও একটু কমে আবার মানুষ বেশি হলে কাজও বাড়ে।
কথাটা প্রসঙ্গত কি না জানি তবুও এই মূহুর্তে শেয়ার করতে ইচ্ছে করছে। আমার চাচাতো ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে (সাধারণত ছেলেরা বিয়ে করে বলা হয়) আমাদের গ্রামেই। আমাদের বাড়ি থেকে দু তিন বাড়ি দূরে ভাবির বাবার বাড়ি। তাই বাবার বাড়ি যাইতেও গাড়ি-ঘোড়া চড়তে হয় না। ডাক্তারের কাছে গেলেও কিংবা মেয়ের বাড়ি গেলেও পায়ে হেটে/ ভ্যানে যেতে হয়। বড় ধরনের গাড়িতে সে উঠে নাই। একবার আমার বোনের শ্বশুর বাড়ি জয়পুরহাটে ভাবিকে পাঠানোর কথা চলছিল। যথারীতি বাসে যেতে হবে এটাই স্বাভাবিক। ভাবির প্রশ্ন ছিল-
আচ্ছা বাসে কেমনে ওঠে? বাসে উঠলেই কি বমি হয়? (সে হয়ত শুনেছে যে অনেকে বাসে বমি করে)
আমি আগে জানতাম না ভাবি কোনদিন বাসে চড়ে নাই। সেদিন জানলাম অথচ জীবনের ৪০টা বছর সে পেরিয়ে এসেছে। কি আশ্চর্য জীবন! তাই না???

কোন প্রসঙ্গে কোথা থেকে ঘুরে আসলাম। যে কথা বলছিলাম- মাকে সেদিন জিজ্ঞেস করলাম করোনা ভাইরাস আসায় আপনার জীবনে কি কি পরিবর্তন এসেছে?
আমার মা একটু রসিকতা করে বললেন- আগে ভাত রানতাম এক পট এখন রাধি ৫ পট 😁

হ্যা আমিও জানি করোনা ভাইরাস আসায় তার জীবনের কোন পরিবর্তন আসেনি। আগে যেমন বাড়ির কাজ করতেন এখনও সেটাই করেন। শুধু আমরাই বোর হয়ে যাচ্ছি, কাজ খুজে পাচ্ছি না।।
এই দুইদিনে হয়ত আমরা কারও জীবনের পট পরিবর্তন করতে পারব না কিন্তু তাদের কাজে তো সহযোগিতা করে তাদের জীবনে স্বল্প সময়ের জন্য হলেও একটু স্বস্তি এনে দিতে পারি। যারা আমরা বাইরে থেকে বাড়িতে এসেছি তারা যদি বাড়ির কাজে সহযোগিতা করি আমার মা, ভাবি, দাদীকে দুদন্ড বসে থাকার সুযোগ দেই, খুব কি অপরাধ হবে???

আমার এই লেখার একটাই উদ্দেশ্য –
আসুন ঘরে বসে ডিপ্রেশনে না পড়ে ঘরের কাজে আমাদের৷ গৃহিণীদের কাজে একটু সহযোগিতা করি। এই কোয়ারেন্টাইনে ঘরের কলহ না বাড়িতে সম্প্রীতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করি। একা একা ভাল না থেকে সবাই মিলে ভাল থাকার চেষ্টা করি।।

উম্মে কুলছুম
শিক্ষার্থী,
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
-We Can, Rangpur.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *