লিঙ্গ পরিচয়ের ভিত্তিতে যে বৈষম্য করা হয় তা-ই লিঙ্গ ভিত্তিক বৈষম্য।
নারী, পুরুষ ও অন্যান্য লিঙ্গের মানুষ সম্পর্কে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ধারণা ভিন্নরকম। আমাদের সমাজ নারীকে দুর্বল ও পুরুষকপ শক্তিশালী মনে করা।আবার তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে অস্পৃশ্য জ্ঞান করে। এই ভিত্তিতে জন্মগত ভাবে পুরুষ, নারী বা তৃতীয় লিঙ্গের হবার কারণে কোনো ব্যক্তিকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা বা হওয়াকেই লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য বলে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়,নারী দুর্বল এ ভ্রান্ত ধারণার ওপর ভিত্তি করে যদি তাকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব না দিয়ে বরং পুরুষকে দেওয়া হয়, কিংবা একই কাজের জন্য যদি নারীকে কম আর পুরুষকে বেশি মজুরি দেওয়া হয়,
কিংবা কেবল পুরুষ বলেই পরিবারের ভরণপোষণের সকল দায়িত্ব যদি কেবল পুরুষকেই নিতে হয়।আবার তৃতীয় লিঙ্গের হবার কারণে যদি কাউকে কোনো সম্মানজনক কাজের সুযোগ না দেওয়া হয়, তাও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য বলে পরিগণিত হবে।
লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের কারণঃ
সমাজে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য কখন থেকে শুরু হয়েছে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা না গেলে ও এই বৈষম্যের কারণসমূহ সহজেই চিহ্নিত করা যায়।
→ সুশিক্ষা ও সচেতনতার অভাব,
→ ধর্মীয় অপব্যাখ্যা,
→ কুসংস্কার,
→ পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা,
→ দারিদ্র্য,
→ সামাজিক রীতিনীতি ও প্রথা।
এবার আসুন লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের ক্ষেত্রসমূহ গুলো এক নজরে দেখি-
সমাজ বিভিন্ন ক্ষেত্রে লিঙ্গ ভিত্তিক বৈষম্য দেখা যায় সেগুলো হলো, শিক্ষা, পোশাক, খাদ্য গ্রহণ, বিশ্রাম, বিনোদন, কাজ/কর্মক্ষেত্রে, মজুরি,চিকিৎসা, বাসস্থান, সম্পদ,মতপ্রকাশ, চলাফেরা, তথ্যপ্রবাহ, পচ্ছন্দ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অধিকার প্রাপ্তি ইত্যাদি।
শিক্ষা:
পুরুষের পরিবারের অর্জনকারী ও সমাজের নেতৃত্বদানকারী এ ধারণা থেকেই নারী পুরুষ স্ত্রী লিঙ্গের মধ্যে শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য করা হয়ে থাকে যেমন কোন কোন পরিবারের ছেলে সন্তানকে স্কুলে পাঠানো হলেও মেয়ে সন্তানকে স্কুলে না পাঠিয়ে ঘরের কাজ শেখানো হয়। ভাবা হয় মেয়েকে পড়াশোনা করে কি হবে? সেতো পরের বাড়ি চলে যাবে।
খাদ্য গ্রহণ:
পুরুষেরা পরিবারের জন্য অর্জন করে ফলে তাদের হতে হবে বলিষ্ঠ , কর্মঠ ও শক্তিশালী এ ধরনের চিন্তা থেকেই পুরুষদের বেশি পরিমাণে ভালো অপুষ্টিকর খাবার দেয়া হয়ে থাকে । অনেক পরিবারে এখনো নারীদের সবার খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে যা অবশিষ্ট থাকে তা খেতে হয়।
কর্ম /কাজের ক্ষেত্র:
লিঙ্গ ভিত্তিক বৈষম্য মূলক শ্রম বিভাজন এর কারণে নারীদের সাধারণত পুনরুৎপাদনমূলক কাজ বেশি করতে হয়। যেমন,রান্নাসংক্রান্ত যাবতীয় দায়িত্ব সামলানো, ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখা,সন্তানের দেখভাল করা ইত্যাদি । এসব কাজ পরিশ্রম সাধ্য ও কষ্টকর হলেও মজুরিহীন। কাজেই এর মূল্যায়ন কম গার্হস্থ্য কাজে এত বেশি সময় ব্যয় করতে হয় যে বাইরের জগত থেকে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ খুব কম পাওয়া যায়। অন্যদিকে পুরুষদের সাধারণত বাড়ির বাইরের উপার্জন মুলক কাজ যথা চাকরি-ব্যবসা কৃষিকাজ ইত্যাদি করতে হয়। পরিবারের জন্য উপার্জনের দায়িত্ব কেবল পুরুষের এ ধারণা থেকে অনেক সময় অনিচ্ছা সত্বেও তাদের ভারী ঝুঁকিপূর্ণ ও অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয়।
চিকিৎসা:
নারীদের অবজ্ঞা অবহেলা দৃষ্টিতে দেখার কারণে চিকিৎসা ক্ষেত্রে তাদের প্রতি বৈষম্য করা হয়। নারীরা অসুস্থ হলে সহজে চিকিৎসা করতে চায়না কম গুরুত্ব দেয়া হয় ।ফলে তাদের জন্য কম খরচে সহজ উপায়ে দায়সারা চিকিৎসা ব্যবস্থা নেয়া হয়। আমাদের দেশে বেশিরভাগ নারীই নিজের কোনো উপার্জনের উপায় নেই। কাজেই নিজের খরচে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য তাদের থাকে না।
সম্পদ:
সম্পত্তিতে নারীর প্রবেশাধিকার ও নিয়ন্ত্রণ কম। জাতিসংঘের দেওয়া তথ্যমতে সম্পত্তিতে নারীর মালিকানা মাত্র ১ শতাংশ। নারীরা হলো দরিদ্রের মধ্যে দরিদ্রতম ।
বাংলাদেশ উত্তরাধিকার নির্ধারণ করা হয় পারিবারিক আইন অনুযায়ী বৈষম্যমূলক বিদ্যমান আইন অনুযায়ী নারীর যতটুকু সম্পত্তি পাওয়ার কথা তা থেকেও তাদের বঞ্চিত করা হয় ।পারিবারিক আইন অনুযায়ী যা বৈষম্যমূলক।বিদ্যমান আইন অনুযায়ী নারীর যতটুকু সম্পত্তি পাওয়ার কথা তা থেকেও তাদের বঞ্চিত করা হয়। পারিবারিক ব্যবসা-বাণিজ্যে ও নারীদের মালিকানা দেওয়া হয় না। তাছাড়া নিজের অর্জিত অর্থব্যয় অথবা সম্পত্তি বিক্রি করার ক্ষেত্রেও নারীদের নানারকম বাধার সম্মুখীন হতে হয়।
চলাফেরা:
প্রচলিত বৈষম্যমূলক জেন্ডার ধারণা ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে নারীদের বাইরে চলাফেরার ক্ষেত্রে নানা বাধা সম্মুখীন হতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাইরে যাওয়ার সময় নারীকে পুরুষের সাথে যেতে হয় ও পরিবারের অনুমতি নিতে হয়। পরিবারের কোনো নারীকে একা বা পুরুষসঙ্গী সহ বাইরে যাওয়ার অনুমতি দিলেও রাস্তা ,যানবাহনে, মার্কেটে ,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ,কর্ম ক্ষেত্রে তাদের নানাভাবে হয়রানির শিকার হবার সম্ভাবনা থাকে ।তাছাড়া আমাদের দেশে প্রয়োজন হলেও নারীরা সাধারণত রাতের বেলায় বাইরে যেতে পারে না।
মতপ্রকাশ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ:
নারীদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ নেওয়ার সুযোগ পুরুষের তুলনায় কম। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের মত প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয় না ,বা সুযোগ দিলেও সেসব মতামতকে গুরুত্বহীন মনে করা হয় ।
নিজের জীবন ,পড়াশোনা ,শরীর, বিয়ে,সন্তান, পোশাক বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রায়ই তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক ভাবে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়।
উক্ত বিষয়গুলো ছাড়াও অনেক কিছু আছে যা লিঙ্গ ভিত্তিতে আমরা বৈষম্যের শিকার।
লেখক – লিজা আক্তার