বিশ্ব সাক্ষরতা দিবস ও নারী প্রেক্ষাপট

শিক্ষা যদি জ্ঞান অর্জনের মূলভিত্তি হয় তাহলে সাক্ষরতা হলো শিক্ষার প্রাথমিক সোপান। আবার এটাও বলা হয়, সাক্ষরতা ও দক্ষতা টেকসই সমাজের মূল কথা। বলা হয়ে থাকে একটি দেশের উন্নয়নের সাথে সাক্ষরতা গভীরভাবে যুক্ত থাকে। সাক্ষরতা দিবস ও পালনঃ ১৯৬১ সালের ডিসেম্বর মাসে পৃথিবীর সব দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূর করতে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। ব্যক্তি, সম্প্রদায় ও সমাজে সাক্ষরতার গুরুত্ব তুলে ধরতে হাজার ১৯৬৫ সালে ইউনেস্কো ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। তবে বাংলাদেশে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে ১৯৭২ সাল থেকে।

সংজ্ঞায় সাক্ষরতাঃ

সাক্ষর শব্দের আভিধানিক অর্থ অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি। এখন সাধারণ অর্থে সাক্ষর বলতে পড়া, লেখা ও হিসাব করায় দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে মনে করা হয়। সাক্ষর ব্যক্তি যেন মাতৃভাষায় সহজে লেখা পড়তে ও বুঝতে পারে, মনের ভাব শুদ্ধ ভাষায় বলতে ও লিখতে পারে; দৈনন্দিন হিসাব-নিকাশ করতে ও লিখতে পারে। বিগত পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশে সাক্ষর ও সাক্ষরতার সংজ্ঞায় নানা পরিবর্তন ও বিবর্তন হয়েছে।

সাক্ষরতা ও বাংলাদেশঃ

বর্তমানে সারা দেশে সাক্ষরতার হার ৭৪ দশমিক ৭ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে দেশে সাক্ষরতার হার দশমিক ৮ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে ৭৪ দশমিক ৭০ শতাংশ হয়েছে। গতবছর দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ৭৩ দশমিক ৯০ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপে সাক্ষরতার এই হার উঠে এসেছে।

সাক্ষরতায় বিশ্বে নারীর অবস্থানঃ

২০১৬ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পৃথিবীতে ৭৭৫ মিলিয়ন মানুষ সাক্ষরতার মৌলিক ধারণা থেকে দূরে রয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন নয়। এই ২০ শতাংশের মধ্যে আবার প্রায় ৬৬ শতাংশ হচ্ছে নারী। প্রায় ৭৫ মিলিয়ন শিশু এখনও হয় বিদ্যালয়ে যায়নি কিংবা বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়েছে। বিশ্বে পনেরো বা তার বেশি বয়সীদের সাক্ষরতার হার ৮৬.৩ শতাংশ, তার মধ্যে পুরুষ ৯০ শতাংশ এবং নারী ৮২.৭ শতাংশ।

সাক্ষরতায় বাংলাদেশ ও নারী প্রেক্ষাপটঃ

দেশে সাক্ষরতার দিক থেকে পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে নারী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমান সাক্ষরতার হার ৭৪.৭০ শতাংশ। এর মধ্যে নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক। নারীদের শিক্ষার হার ৭১ দশমিক ২ শতাংশ।

২০১৯ সালে বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) দেশের শিক্ষার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে একটি সমীক্ষা প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায়ে মোট ছাত্রছাত্রীর প্রায় ৫১ শতাংশ ছাত্রী। মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যায়ে মোট শিক্ষার্থীর ৫৪ শতাংশের বেশি ছাত্রী। এইচএসসি পর্যায়ে মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা কিছুটা এগিয়ে থাকলেও এক্ষেত্রে সমতা প্রায় প্রতিষ্ঠার পথে। ওই স্তরে ছাত্রীর অংশগ্রহণের হার ৪৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ।বিগত সময়ের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি), জেএসসি-জেডিসি এবং এসএসসি পরীক্ষার পরিসংখ্যানেও দেখা গেছে, অংশগ্রহণেই শুধু বেশি নয়, সফলতা অর্জনের দিক থেকেও নারীরা এগিয়ে রয়েছে।

ব্যানবেইস তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রীদের ভর্তির হার বেশি হলেও নারীদের ঝরে পড়ার হারও বেশি। স্কুল, মাদ্রাসা ও ভোকেশনাল শিক্ষায় ৪০ শতাংশ ছাত্রী ঝরে পড়ছে। যেখানে ছাত্র ঝরে পড়ছে ৩৭ দশমিক ৬২ শতাংশ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের ৪২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬ লাখ ৭৬ হাজার ৬২৩ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২ লাখ ৫১ হাজার ৮ জন ছাত্রী। যা মোট শিক্ষার্থীর ৩৭ দশমিক ০৯ শতাংশ। এছাড়া ১০৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ লাখ ২৮ হাজার ৩১৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৪৫ জন নারী। যা মোট শিক্ষার্থীর ২৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারীর উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের ক্ষেত্রে এখনো অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে। এটা আরো বেশি মফস্বল এলাকার নারীদের। উচ্চশিক্ষার জন্য আবাসনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্ত আবাসনের সুযোগ নেই। সামাজিক নিরাপত্তার অভাব রয়েছে। এছাড়া দারিদ্র্যের কারণে অনেক বাবা-মা আগে আগেই মেয়েদের বিয়ে দিচ্ছেন।

প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষায় মেয়েদের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমাটা উন্নয়নশীল দেশের চিত্র। আর্থ-সামাজিক কারণে এমনটি হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। উচ্চ শিক্ষার ব্যয় বেশি। সরকারের পক্ষ থেকে তেমন আর্থিক সহায়তা নেই এই স্তরের শিক্ষায়। পরিবারও ছেলের পেছনে শিক্ষা ব্যয় করতে বেশি আগ্রহী। মেয়েদের যাতায়াতেও সমস্যা হয়। এছাড়া এসএসসির পর মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার একপ্রকার ঝোঁক থাকে। এ কারণে উচ্চ শিক্ষায় মেয়েরা পিছিয়ে রয়েছে।

যে কোন একটি দেশের উন্নয়ন করতে গেলে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই মায়েদের (নারী) সুশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া জরুরি।

সাক্ষরতায় এ বছরের প্রতিপাদ্যঃ

বিশ্ব সাক্ষরতা দিবস এ বছরের প্রতিপাদ্য হলো, ‘কোভিড-১৯ঃ সাক্ষরতা শিক্ষায় পরিবর্তনশীল শিখন-শেখানো কৌশল এবং শিক্ষাবিদদের ভূমিকা।’ বর্তমান পরিস্থিতিতে সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি পড়েছে। এই কোভিড-১৯ পরিস্থিততে শিক্ষা ক্ষেত্রে পরিবর্তন ও শিক্ষাবিদদের আচরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমানে সবকিছু অনলাইন ভিত্তিক হয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় সাক্ষরতার হার বাড়ানোর পদ্ধতি গুলোতেও পরিবর্তন করা দরকার। কৌশলগত পরিবর্তন আনতে হবে শিক্ষা ব্যবস্থায়। সবার কাছে যেন শিক্ষা পৌঁছাতে পারে সে ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিতে হবে। বিশেষ পরিস্থিতিতে শিক্ষা যেন বিশেষ শ্রেণির জন্য কুক্ষিগত না হয় সেদিকে নজর দিতে হবে। নারী ও শিশুদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা নিতে হবে যেন তারা এই আওতায় এসে শিক্ষা গ্রহণ থেকে পিছিয়ে না পড়ে।

সাক্ষরতাকে ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং মানব উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ধরা হয়। কারণ দারিদ্র্য হ্রাস, শিশুমৃত্যু রোধ, সুষম উন্নয়ন, শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা হার বৃদ্ধি জরুরি। সাক্ষরতার পরিবর্তিত সংজ্ঞা অনুযায়ী আমাদের অবস্থান কোথায় স্ট্যান্ডর্ড মানদ-ে সেটি পরিমাপ করতে হবে, শুধুমাত্র সংখ্যার বৃদ্ধিতে উন্নীত করে তৃপ্তি পাবার অবকাশ নেই।

লেখিকাঃ কুলছুম উম্মে, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর। “বিশ্ব সাক্ষরতা দিবস ও নারী প্রেক্ষাপট “, দৈনিক বায়ান্নর আলো।

-৮ ই সেপ্টেম্বর ২০২০,সোমবার।

https://www.dailybayannoralo.com/news/special-report/YYo9?fbclid=IwAR0rgwtsyDyK45sT8BeHReMnAGLx4edoYRs8p9sgMXgu-csFGyZPibmV-G0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *